বিশ্ব

পশ্চিমা শক্তিকে পাশ কাটিয়ে নতুন বৈশ্বিক শক্তি উত্থানের ইঙ্গিত!

চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিন পিং প্রথমবারের মতো রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন।

ইউরোপে বিগত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধে আগ্রাসনকারীদের প্রতি সংহতির বার্তা এসেছে এই বৈঠক থেকে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ পশ্চিমা নেতারা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

এদিকে এ সপ্তাহে বেইজিংয়ে ভ্লাদিমির পুতিন ও কিম জং উনের উপস্থিতি দেখাচ্ছে, কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, সি স্বৈরশাসকদের পাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের হুমকি, নিষেধাজ্ঞা আর শুল্ককেন্দ্রিক কূটনীতি দীর্ঘদিনের মিত্রতার সম্পর্কে চাপ তৈরি করছে।

চীনের রাজধানীতে এই ঐতিহাসিক বৈঠক নতুন এক ত্রিপক্ষীয় অক্ষ গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত জুনে রাশিয়া–উত্তর কোরিয়ার মধ্যে হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর ভিত্তি করে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের ঘনিষ্ঠ জোট সেই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এর ফলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

গতকাল সোমবার সি মন্তব্য করেন, ‘আমাদের অবশ্যই আধিপত্যবাদ আর ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে এবং প্রকৃত বহুপক্ষবাদের চর্চা করতে হবে।’ এই মন্তব্যকে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে উদ্দেশ করে তাঁর পরোক্ষ আক্রমণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগের দিন তিয়ানজিনে সি ও পুতিন ২০ টির বেশি অ-পশ্চিমা দেশের নেতাদের সামনে তাদের নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার প্রস্তাব তুলে ধরেন। এরপর কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক তাদের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এই বৈঠকের ঠিক আগে ৩ সেপ্টেম্বর চীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি উপলক্ষে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ।

এদিকে, সাত বছর পর প্রথমবার চীন সফরে এসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সি তাঁর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে স্বস্তি ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে ভারতের পণ্যের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় নয়া দিল্লি ক্ষুব্ধ।

ট্রাম্প নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি দাবি করছেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন, আলাস্কায় পুতিনকে নিয়ে ইউক্রেন শান্তি সম্মেলন করেছেন এবং এ বছরই কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করছেন। তবে পূর্বে যদি নতুন সামরিক শক্তির জোট গড়ে ওঠে—যেখানে এক যুদ্ধ আগ্রাসীও যুক্ত থাকে—তাহলে তা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বড় সতর্ক সংকেত হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল ব্যুরো অব এশিয়ান রিসার্চের বিশ্লেষক ইয়ংজুন কিম মার্চ মাসে লিখেছিলেন, ‘রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া এখন প্রায় অবশ্যম্ভাবী।’ তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধ মস্কো ও পিয়ংইয়ংকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলেছে।’

ইয়ংজুন আরও বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও চীন ও রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল, তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণে…অথচ এখন তারা উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক মিত্র হয়ে উঠছে, বিশেষ করে কোরীয় উপদ্বীপে কোনো সংকট দেখা দিলে।’

কিম জং উন ইউক্রেন যুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন। চীন ও ভারত যেখানে রাশিয়ার তেল কিনে যাচ্ছে, সেখানে উত্তর কোরিয়ার নেতা ইউরোপের দোরগোড়ায় পুতিনের পক্ষে লড়াই করতে ১৫ হাজারের বেশি সেনা পাঠিয়েছেন।

২০২৪ সালে তিনিই পিয়ংইয়ংয়ে পুতিনকে স্বাগত জানান—২৪ বছরের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম শীর্ষ সম্মেলন। একে সি চিনপিংয়ের জন্য অপমান এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হয়েছিলো।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, কুরস্ক অঞ্চলে লড়াই করতে যাওয়া উত্তর কোরিয়ার সেনাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন ইতোমধ্যেই নিহত হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছে, পিয়ংইয়ং আরও সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পুতিন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনেও বলেন, নিরাপত্তা ক্ষেত্রে একটি ‘ন্যায্য ভারসাম্য’ ফিরিয়ে আনা জরুরি।

এটি আসলে ন্যাটো ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা নিয়ে রাশিয়ার দাবি। তার এই বেইজিং সফর এবং সি ও কিমের সঙ্গে বৈঠক পুতিনের পরবর্তী কৌশলের ইঙ্গিত দিতে পারে।

আগামীকাল বুধবারের সামরিক কুচকাওয়াজে ইরানের প্রেসিডেন্টও যোগ দিচ্ছেন। পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা এটিকে বলছেন ‘অশান্তির অক্ষ।’

শেয়ার করুন

editor

পরিচয় নিউজের একজন নিয়মিত লেখক ও সাংবাদিক।

এই লেখকের সব লেখা দেখুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *