অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমায় হতাশ সাধারণ গ্রাহক

স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য ও আস্থার বিনিয়োগ মাধ্যম হচ্ছে সঞ্চয়পত্র। তবে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর ঘোষণায় হতাশ সাধারণ গ্রাহক।

সরকার বলছে, সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়িয়ে দিলে সবাই সঞ্চয়পত্র কিনবে, কেউ আর ব্যাংকে টাকা রাখবে না। এদিকে বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সরকার সুদহার কমানোয় নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা চাপে পড়বেন।

গত ৩০ জুন পর্যন্ত যে হার ছিল তাতে সবাই মোটামুটি ভালো মুনাফা পেতেন। যাদের কাজ করার শারীরিক সামর্থ্য নেই তাদের জন্য সঞ্চয়পত্রের চেয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো বিনিয়োগ ক্ষেত্র নেই।

মুনাফার হার কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) গত মঙ্গলবার (১ জুলাই) জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত পাঁচটি সঞ্চয় স্কিমে মুনাফার হার আগামী ছয় মাসের জন্য কমিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।

যেখানে, স্কিম অনুযায়ী এখন থেকে মুনাফার সর্বোচ্চ হার হবে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। এর আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি এসব স্কিমে মুনাফার হার ছিল ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত।

মুনাফার হার কমানো পাঁচ স্কিমের মধ্যে রয়েছে- পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র এবং পোস্ট অফিস ফিক্সড ডিপোজিট বা ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক মেয়াদি হিসাব।

অবসরপ্রাপ্ত এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, পেনশন আর কিছু সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে আমার সংসার চলে। এক-দুই হাজার টাকা কম পাওয়া মানেও আমার জন্য সমস্যার।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুনের জন্য একটি সুদহার নির্ধারণ করেছিল সরকার। ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য নতুন সুদহার নির্ধারণ করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি আবার সুদহার বাড়বে, কমবে নাকি নতুন হার নির্ধারণ হবে সেটি সে সময় জানা যাবে।

সাড়ে সাত লাখ ও সাড়ে সাত লাখের বেশি বিনিয়োগের এই দুটি ধাপে বিনিয়োগে সুদহার ভিন্ন। পাঁচটি স্কিমে যিনি যে সময়ে সঞ্চয়পত্র কিনবেন, সেই সময়ের সুদহার অনুযায়ী মেয়াদকালীন তিনি মুনাফা পাবেন।

নতুন ঘোষণায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য দুটি ধাপ রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচের বিনিয়োগকারী। দ্বিতীয় ধাপটি হলো ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার ওপরের বিনিয়োগকারী।

জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের আওতায় ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড এবং ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক সাধারণ হিসাব- এই চারটি স্কিমের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

নতুন সুদহারে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভাজন নির্ধারণ
১ জুলাই ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন স্কিমে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।

নতুন হারে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিভাজন নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। যাদের বিনিয়োগ এ সীমার নিচে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি মুনাফা পাবেন। আর যাদের বিনিয়োগ সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি, তাদের জন্য মুনাফার হার কিছুটা কম হবে।

পেনশনার সঞ্চয়পত্রেও একই রকম কমেছে। আগে পাঁচ বছর মেয়াদি এ স্কিমে সাড়ে সাত লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ছিল ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা এখন ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগকারীরা আগে পেতেন ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, এখন পাবেন ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ।

৩ বছর মেয়াদি তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা তিন মাস অন্তর মুনাফা সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ছিল ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ।

বর্তমানে এটা ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা মেয়াদ ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে মুনাফা পান। এখন পাবেন ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ হারে।

মুনাফার হার কমায় গ্রাহকদের ক্ষোভ
মুনাফার হার কমাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি ও পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমিয়ে মধ্যবিত্তের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে আরও বেশি কর আদায়ের পথ তৈরি করছে।

অবসরপ্রাপ্ত আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাই, শেয়ারবাজার তেমন একটা বুঝি না, তাই সঞ্চয়পত্রই আমার একমাত্র ভরসা। এখন যদি এটাতে কম রিটার্ন পাই, তাহলে কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করবো?’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের কথা বিবেচনা না করে যদি কেবল অর্থনৈতিক সূচকের ভারসাম্য রক্ষার নামে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে সমাজে অসন্তোষ ও অসাম্য আরও বাড়তে পারে।

সরকার থেকে যা বলা হয়েছে
সরকারি ব্যয় কমানো, ব্যাংক ও অন্য আর্থিক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমানো হয়েছে।

গত শনিবার অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়িয়ে দিলে সবাই সঞ্চয়পত্র কিনবে, কেউ আর ব্যাংকে টাকা রাখবে না। এতে ব্যাংকগুলোতে লিকুইডিটির ব্যাপার আছে আর সবাই সঞ্চয়পত্র কিনলে ব্যাংক কোথায় টাকা পাবে।’

এ বিষয়ে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত কিংবা পেনশনের টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনে সেখান থেকে মুনাফা পান। তা দিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। মুনাফার হার কমলে তারা প্রভাবিত হবেন।

শেয়ার করুন

editor

পরিচয় নিউজের একজন নিয়মিত লেখক ও সাংবাদিক।

এই লেখকের সব লেখা দেখুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *